ডিজিটাল বাংলাদেশের ‘বাতিঘর’ তিনি

১৭ মার্চ, ২০২১ ০৩:২৪  
দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই একটি আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর বাংলাদেশের রূপকল্প এঁকেছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭০-সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে ওই বছরের ২৮ অক্টোবর রেডিও টিভিতে দেওয়া ভাষণে ‘শ্যাখ সাহেব’ তুলে ধরেছিলেন সেই রূপকল্পের প্রতিচ্ছবি। ওই সময়ের কৃষি অর্থনীতিকে লক্ষ্য করে সোনালী আঁশ পাটের গবেষণাতে গুরুত্বারোপ করেই ক্ষান্ত হননি ‘মুজিব ভাই’। ভাষণে তিনি বলেছিলেন, পানি সম্পদ সম্পর্কে গবেষণা এবং নৌ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্যে অবিলম্বে একটি নৌ-গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা প্রয়োজন। ‘জনগণের অবিসংবাদিত নেতা’ হয়ে তিনি আরও বলেছিলেন ‘পাঁচ বছরে আমরা বাংলাদেশে ২৫০০’ কিলোওয়াটস বিজলী উৎপাদন করতে চাই। রূপপুর আণবিক শক্তি এবং জামালগঞ্জের কয়লা প্রকল্প অবিলম্বে বাস্তবায়িত করতে হবে।’ আর এসব কাজের জন্য যোগ্য মানবসম্পদ গড়ে তুলতে ‘শ্যাখের পোলা’ গুরুত্ব দিয়েছিলেন শিক্ষার ওপর। বিশেষ করে প্রযুক্তি নির্ভর কারিগরি শিক্ষায়। বলেছিলেন ‘৫ বছর বয়স্ক শিশুদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্যে একটা ‘ক্র্যাস প্রোগ্রাম’ চালু করতে হবে। মাধ্যমিক শিক্ষার দ্বার সকল শ্রেণীর জন্যে খোলা রাখতে হবে। দ্রুত মেডিক্যাল ও কারিগরী বিশ্ববিদ্যালয় সহ নয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দারিদ্র যাতে উচ্চ শিক্ষার জন্যে মেধাবী ছাত্রদের অভশাপ হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।’ আর দেশ স্বাধীনের পর এই দর্শন বাস্তবায়নে ব্যাপৃত হয়েছিলেন টুঙ্গি পাড়ার খোকা থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠা স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পরই তিনি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেন। সেই লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন ‘জনগণের অবিসংবাদিত নেতা’ রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। কমিশনের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন নিজের শিক্ষক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই -খুদা-কে। পাশাপাশি তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের প্রধান শক্তি বা হাতিয়ার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারে উদ্যোগী হন বঙ্গবন্ধু। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে বিজ্ঞানমনস্ক জাতি হিসেবে গড়ে ওঠে, সে উদ্যোগও নেন তিনি। তার প্রচেষ্টায় ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের (আইটিইউ) সদস্যপদ লাভ করে বাংলাদেশ। স্যাটেলাইট অরবিট বা ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিমালা তৈরি এবং এর বরাদ্দে সহযোগিতা দেওয়া ও সমন্বয়ের কাজে নিয়োজিত আইটিইউ এর মাধ্যমেও মহাকাশ মিশনে উঁকি দেয় যুদ্ধ বিদ্ধস্ত বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া ভূউপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । বর্তমানে উক্ত কেন্দ্রের মাধ্যমে সৌদি আরব, সিংগাপুর , হংকং, ওমান, পাকিসত্মান, কয়েত, কাতার, বাহরাইন, জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মুম্বাই অর্থ্যাৎ মোট ১১টি দেশের সাথে টেলিফোন ডাটা কমিউনিকেশন, ফ্যাক্স, টেলেক্স ইত্যাদি আদানপ্রদান করা হয়। প্রায় ৩৫,৯০০ কিঃ মিঃ বা ২২,৩০০ মাইল উর্ধ্বাকাশে অবস্থিত কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে শক্তিশালী এন্টানার দ্বারা বার্তা/তথ্য আদান প্রদানের কাজ সম্পাদিত হয়। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ভিত্তি রচিত হয়। সর্বোপরি ডিজিটাল বিপ্লবে শামিল হওয়ার পথ সুগম হয়। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। এই বিপ্লবটি হবে মূলত ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটির মতো বিষয়গুলোর মাধ্যমে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস, ইন্টারনেট অব থিংস, নিজে চলা গাড়ি, ত্রিমাত্রিক প্রিন্টিং, ন্যানো টেকনোলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, শক্তি সঞ্চয় কিংবা কোয়ান্টাম কম্পিউটিং।